আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় – বিয়ের নাচ।যা “সারা বিশ্ব জুড়ে নাচ” খন্ডের অন্তর্ভুক্ত।
বিয়ের নাচ

বিয়ের-উৎসব কেন্দ্র করে এই নাচ । প্রাচীন জার্মানগণ সাধারণ ভাবে উল্লেখ করেছে “বউ ঘুরা” যদিও বৈশিষ্ট্যে দিক্ থেকে প্রতীকপূর্ণ, বিয়ের নাচকে অন্য সাধারণ গোলক-নাচ থেকে অল্পই পার্থক্য করা যায় যার কোন বিশেষ প্রয়োজন নাই।
অন্যানা বিয়ের প্রথার মত মনে মনে সব সময়ই ধারণা করা হয় যে, বর-বধু বিশেষ অজ্ঞাত বিপদের সম্মুখীন এবং এ ধারণা থেকে তাদের রক্ষার জন্য অবশ্যই বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়। শুধুমাত্র তিনটি একক মৌলিক প্রসঙ্গ এখানে বিবেচনার জন্য প্রয়োজন। প্রথমটি জীবনের এক স্তর থেকে অন্য স্তরে উত্তরণ এই ধারণা বদ্ধমূল, দ্বিতীয়টি ক্ষমতার সঞ্চরমাণ ধারণা তৃতীয়টি এটার পবিত্রতা।
মৌলিক প্রসঙ্গ উত্তরণ পুরাতন জার্মান প্রথায় পরিস্কারভাবে দেখা যায় “নাচের বউকে বাহির করা” অবিবাহিতদের দল থেকে বাইরে। দুটা গোলকে নাচুয়েগণ বউকে ঘিরে রাখে, মেয়েরা মধ্য গোলকে থাকে বাইরের গোলকে যুবকেরা। বর গোলকের মধ্যে দিয়ে যেতে চেষ্টা করে সঙ্গে বিবাহিত মহিলাগণ তীব্র চিৎকার করতে থাকে।
এটার অর্থ পরিস্কার। এটার মত মিল আছে “পুরান স্ত্রীদের নাচ” ভরসফিল্ড জেলার বার্নসউইকের বিবাহ অনুষ্ঠানে। এখানে বিবাহিত মহিলাগণ তাদের নতুন বোনের সঙ্গে নাচে। বৈবাহিক অবস্থার সূচনায় কার্যকর ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান চিন্তায় আনা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার এবং এখানে যদিও কোথাও বলার কিছু থাকে যা ভন জিনাপ বলেন “যাওয়ার ধর্মীয় উৎসব” নব-বধুকে তার নিজের বাড়ীর দখল নিজেকে নিতে হয়।
উদাহরণ স্বরূপ মলুউকাসের কেরম দ্বীপে বধুকে নতুন বাড়ী দিকে লাগান মইকে ঘিরে নয় বার লাফ দিতে হয় তারপর সে তাতে চড়ে নতুন বাড়ীতে আরোহণ করতে পারে। এই ধরনের বিয়ের নাচের অনেক উদাহরণ জার্মানীতে আছে তার অনেকগুলি উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। গ্রীসটেমান্ডের নিকটে ব্রামষ্টেডটে বাইরের সম্প্রদায়ের বধুকে তার সমস্ত যৌতুক সহ রোলান্ড মূর্তি তিন বার প্রদক্ষিণ করতে হত।
ফায়ার প্লেস” বা পট-কীলককে তিনবার প্রদক্ষিণ করার প্রথা পশ্চিম জার্মানীতে খুবই সাধারণ। দানিয়ুব পাড়ের ক্রেমসের প্রত্যেক দম্পতিকে নির্দিষ্ট লিন্ডেন গাছকে ঘিরে তিনবার নাচতে হয় এবং ওয়েষ্ট ফালিয়াতে ওক গাছকে ঘিরে। গ্রীসের রক্ষণশীল প্রথা এই ধারণাভুক্ত যে, বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত বিয়ের কার্য পরিচালনাকারী পাদ্রী (ধর্মযাজক) ভাবগম্ভীরভাবে নব- দম্পতিকে ধর্ম প্রচার মঞ্চ তিনবার প্রদক্ষিণ না করাবেন।
দ্বিতীয় মৌলিক প্রসঙ্গ জাভাতে সংরক্ষিত। বড় ছেলের বিয়েতে দাদা-দাদী এবং এমনকি সম্ভবতঃ পরীদাদা-দাদী আগুনের পাখা হাতে নিয়ে নাচে এই জন্য যে, তাদের শক্তি নবদম্পতিতে সঞ্চারিত হবে। তৃতীয় মৌলিক প্রসঙ্গ আগুনের চারদিকে অথবা মধ্য দিয়ে সমবেতভাবে লম্ফঝম্ফ করা। এই মৌলিক প্রসঙ্গ প্রায়ই মিথ্যাভাবে ইন্দো-ইউরোপীয় সভ্যতার সঙ্গে বর্ণনা করা হয়। কিন্তু সত্যিকারের বেলায় বলতে হয় এটা আরো পুরানো এবং আরো ব্যাপকভাবে প্রসারিত।
মূর্তিপূজক জার্মানীর বক্তৃৎসবে লাফ দেয়ার প্রথা সতর্ককরণের জন্য এবং খ্রীষ্টানদের কুয়াড্রাগসিমাল, চিয়ান-উৎসব ও সেন্ট জন’স ইভে আগুনের মধ্যে দিয়ে লাফ অন্য প্রয়োজনে হয় যাতে সারা বৎসর জনগণ জ্বরজাড়ি থেকে নিরাপদ থাকে। বাস্তবিক এই প্রথা সমগ্র এশিয়া এবং দক্ষিণ-সাগর এমনকি আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত। জুডার রাজা আজ পৌত্তলিকতায় ঘৃণা ভরে তার ছেলেকে আগুনের মধ্য দিয়ে যেতে বাধ্য করেছিলেন।
এই উদ্ধৃতির কৌতুহলপূর্ণ বৈপরীত্যে লুডউইগ বরণ বলেন যেমন রথচাইল্ড অব ফ্রাঙ্কফার্ট “ছোট একজন মাটিতে ছোট বাতিগুলি জ্বালায়ে হানুকা ভোজ উৎসবে পিছন ফিরে সামনে লাফ দেয় শিশু সুলভ হাসিভরে যেটা ইসরাইলের প্রথা”। অধিকন্তু আগুনের চারধারে শিশুদের নাচ ল্যাগ বোয়োমারে সন্ধ্যাকালে ভোজ-উৎসবে এখনও প্যালেষ্টইনদের মধ্যে সাধারণভাবে প্রচলিত ।
নিউ গিনির বুকাউয়াতে আজও কোন মেয়েকে প্রথম রজঃদর্শনের সময় একজন সহায়তাকরীর সাহায্যে বিরাট আগুনের মধ্যে দিয়ে লাফ দিতে হয়। এমনকি সাসটা ইন্ডিয়ানদের মত অনেক প্রাচীন সভ্যতায়, যাদুকারী যাজিকা উৎসককে পবিত্র করে, যেখানে চারজন পুরুষ একজন যুবতীকে মাথা আগে দিয়ে বয়ে নেয়, তাদের অদ্ভুত বাঁ পায়ের চলনে আগুনকে ঘুরে অথবা যুবতীকে দশবার সামনে পিছনে আগুন অতিক্রম করায় যখন সে পূর্ব দিকে মুখ করে মাথা নিচু করে শক্ত দঁড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় হাঁটুর উপর ঝুলতে থাকে।
১৬৮৬ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে তরুণীদের মোমবাতির উপর লাফ দেয়ার মৌলিকপ্রসঙ্গ জানাছিল । কলম্বিয়া ও ভেনিজুয়েলার গুয়াহিবোরদে শেষকৃত্য ধর্মীয় আচারে কবিরাজ আগুনের মধ্য দিয়ে লাফায় এবং সর্বশক্তি দিয়ে ফু দেয়। উত্তর-পূর্ব ব্রাজিলের আদিম ক্যানেলা জনগোষ্ঠীর যুবসম্প্রদায় ঐ একই রকম করে। ম্যাক্সিকোর পুরান নাহউয়াদের ইন্দো- ইউরোপীয়দের মতই সম্পূর্ণ একই ধরনের প্রথা আছে। পরা পোষাক একসঙ্গে সেলাই করে দেওয়া, বিবাহিত দম্পতি আগুনের চারপাশ ঘিরে সাতবার নাচতে থাকবে ।
বিয়েতে ধর্মীয় আচারের সাধারণ তাৎপর্য শক্তিকে যাদুকরা, নির্দিষ্ট অর্থে সমৃদ্ধিশীলতা আকর্ষণ করা। সবচেয়ে প্রয়োজন প্রদক্ষিণ করা সেটা যে কোন নাচকে ঘিরে হলেও বিভিন্নতা থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ইলী-এট-ভিলেইনে মেয়েরা বিয়ের বাসনা পোষণ করলে কাঁটা-গাছের তিন ডাল ঘিরে তিনবার নাচে এবং আউভারজেনে নতুন বিবাহিত দম্পতি পবিত্র পাথর ঘিরে তিনবার নাচে। এই আবর্ত শেষ করতে আমরা অস্ট্রেলিয়ানদের পাথরের স্তুপের চারদিকে ঘিরে নাচের উল্লেখ করতে পারি।
বিয়ের নাচমূর্তিপূজক প্রুশিয়ানদের প্রথা বিপরীতমুখী, নব-বধুকে নতুন বাড়ীর দ্বারপ্রান্তে আগুন জ্বালায়ে অভ্যর্থনা করা হয়। একজন যুবক মশাল ও একজন বিয়ার নিয়ে বধুর বাহনকে ঘিরে তিনবার দৌড় দেয়। দৃশ্যতঃ এই প্রথাও অবস্থান্তর প্রাপ্ত ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অধিকারভুক্ত।
আগুন-নাচের প্রসঙ্গে আমাদেরকে অবশ্যই মশাল-নাচ বিবেচনায় রাখতে হবে যার শেষ প্রদর্শনী প্রুশিয়ার রাজদরবারে অনুষ্ঠিত হত বিয়ের উৎসবের শেষ অংশ হিসাবে এবং এখনও সেই জনশ্রুতি মেয়ার বিয়ার কম্পোজিশনে বিদ্যমান।
বিয়েতে বর কনের সামনে উৎসবমুখর ট্রাম্পপেট, সিম্বালের শব্দে রাষ্ট্রের বারজন মন্ত্রী হাতে মোমের মশাল নিয়ে দুইজন দুইজন করে অগ্রসর হয় বৃত্তের শেষ ঘুরার পরে রাজপরিবারভুক্ত ব্যক্তিবর্গ দম্পতিকে পাহারা দিয়ে বাসর ঘরে দিকে নিয়ে যায়। এখানে বালকভৃত্যগণ গণ্যমান্য ব্যক্তিদের থেকে মশাল নিয়ে বাসর ঘর আলোকিত করে।
এই মশাল নাচে প্রথম অংশে দম্পতি একাই নাচে, পরে বধু রাজাকে নাচতে আহ্বান করে তারপরে অন্য যুবরাজদের তখন বর রানীর সঙ্গে পরে রাজকুমারীদের সঙ্গে নাচে।বিয়ের নাচ জার্মানীর লোক প্রথায় একই ধরনের উৎসবের অস্তিত্ব বিরাজমান, বধু প্রথমে সবচেয়ে বয়স্ক আত্মীয়ের সঙ্গে নাচবে পরে সমস্ত পুরুষের সঙ্গে এবং বর সমস্ত মহিলাদের সঙ্গে নাচবে। সংশ্লিষ্ট উৎসব ফ্রান্সের রাজ দরবারে আছে তবে একটু ভিন্ন প্রকৃতির, প্রথম নাচ রাজ-দম্পতির দ্বারা সম্পন্ন হবে ।
মশাল-নাচে সম্ভবতঃ দুটা উৎস মুখ আছে : শ্রদ্ধার প্রতীক এবং বিয়ের মশাল। ষোল শতাব্দী পর্যন্ত বিয়ের অনুষ্ঠান ছাড়া নাচে মশাল আগে বহন করা সর্বোচ্চ রাজর্ষিক সম্মানের ব্যাপার এমনকি প্রাচীনকালে সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন বিয়ের মশাল জীবন এবং প্রেমের সর্বজনবিদিত প্রতীক।
গ্রীস ও রোমে একজন বালক বর-কনের সামনে মশাল বহন করে এবং এরা নিজে একজন মশাল বাহক ছিলেন। একটা এই রকম প্রথা বেঁচে আছে এল্ব অববাহিকায় প্রাচীন স্লাভিক বসবাসকারী পোল্যাবসদের মধ্যে। মধ্যাহ্ন আহারের পর তরুণীগণ মালা পরে জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে নাচে ।

এই দুই মৌলিক প্রসঙ্গে আলো বা মোমবাতি-নাচ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ না, কিন্তু মশাল বিভিন্ন ধরনের চিন্তধারার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। হলি-ল্যান্ডে পুরুষগণ মশাল নিয়ে ইয়ম কিপপুর-মন্দিরে নারীদের দরবারে নাচে। সুপ্রাচীন চীনে মশাল-নাচ দিয়ে প্লেগকে যাদুমন্ত্র করে তাড়ান হোত।
আলাস্কার এস্কিমোগণ একটা ভোজ উৎসবে মশাল নিয়ে বন্য চক্র-নাচ করেএবং পূর্ব-আফ্রিকার লাইন করা নাচুয়েগণ জ্বালান মোমবাতি নিয়ে আস্তে আস্তে অগ্রসর হয়। সবশেষে গীর্জার সমস্ত শোভাযাত্রা এই চক্রের (অধ্যায়) আওতাভুক্ত।
