ভারতীয় সঙ্গীতে প্রচলিত পৃথক তাল পদ্ধতি

আজকে আমরা আলোচনা করবো ভারতীয় সঙ্গীতে প্রচলিত পৃথক তাল পদ্ধতি

 

ভারতীয় সঙ্গীতে প্রচলিত পৃথক তাল পদ্ধতি
ভারতীয় সঙ্গীতে প্রচলিত পৃথক তাল পদ্ধতি

 

ভারতীয় সঙ্গীতে প্রচলিত পৃথক তাল পদ্ধতি

ভারতীয় সঙ্গীতে যে দু’টি পৃথক পদ্ধতি আছে, তা আমরা আগেই জেনে এসেচি। পদ্ধতীর ভিন্নতার জন্য, তালের ভিন্নতাও স্বাভাবিক। তাই এবার আমরা হিন্দুস্থানী ও কর্ণাটক তাল-পদ্ধতির বৈশিষ্টগুলি জানবার চেষ্টা করব।

উত্তরী বা হিন্দুস্তানী তাল পদ্ধতি

আমরা জানি, উত্তর ভারতীয় পদ্ধতীতে ধ্রুপদ, ধমার টপা, খাল, ঠুমরী এবং বহু, প্রকারের লঘু, সঙ্গীত প্রচলিত আছে। এই প্রকারগুলির গীত-রীতি এক নয়। তাই এগুলির সঙ্গে সঙ্গত করার জন্য বহু রকমের তাল গণেীরা রচনা করেচেন । এই তালগালির মাত্রা-সমষ্টি, বিভাগ, ছন্দ-বৈচিত্র্য প্রভৃতি কোথাও সমান, কোথাও বা ভিন্ন।

যেমন—

তেওরা ও রূপক—

দুটিরই মাত্রা-সংখ্যা ৭, বিভাগ ও এবং দুটিরই বিভাগ করা হয়েছে ৩।২।২ মাত্রা হিসেবে।

কাহারা ও ধমালী—

উভয়েরই মাত্রা সংখ্যা ৮ কিন্তু প্রথমটির বিভাগ দুটি চার-চার মাত্রার এবং দ্বিতীয়টির চারটি বিভাগ সমান দাই-দাই মাত্রা বিশিষ্ট।

ঝাঁপতাল ও সুরফাঁকতাল –

দুটিরই মাত্রা সংখ্যা ১০ কিন্তু ঝাঁপতালের চারটি বিভাগ করা হয়েছে হাত।২।৩ মাত্রা হিসেবে কিন্তু সুরফাঁকতালের— পাঁচটি বিভাগ সমান ২।২ মাত্রা ভাগের ।

চৌতাল ও একতাল –

দুটি তালেরই মাত্রা সমষ্টি ১২ এবং সমান দুটি বিভাগ করা হয়েছে ২২ মাত্রা হিসেবে ।

 

ভারতীয় সঙ্গীতে প্রচলিত পৃথক তাল পদ্ধতি
ভারতীয় সঙ্গীতে প্রচলিত পৃথক তাল পদ্ধতি

 

আড়াচৌতাল, ধমার, দীপচন্দী ও ঝুমরা—

প্রত্যেকটি তালেরই মোট মাত্রা-সংখ্যা ১৪; কিন্তু আড়াচৌতালে ১৪ মাত্রাকে ৭টি সমান ভাগে ভাগ করা হয়েচে—যার বিভাগগালি ২২ মাত্রা বিশিষ্ট, ধর্মারের ১৪ মাত্রাকে তেমনি বিভক্ত করা হয়েচে সম্পূর্ণ বিপরীত ভাবে । এর মোট চার ভাগের প্রথম বিভাগে আছে ৫ মাত্রা, দ্বিতীয় বিভাগে ২ মাত্রা তৃতীয় বিভাগে ৩ মাত্রা এবং চতুর্থ বিভাগে ৪ মাত্রা। দীপদী ও ঝুমরার মাত্রা সংখ্যাও যেমন এক, তেমন তার বিভাগ এবং বিভাগীয় মাত্রা সংখ্যার মধ্যেও কোন তফাৎ নেই। তফাৎ শব্দে বোল-বাণী ও ছন্দ বৈচিত্র্যে।

আবার গজরা ও পঞ্চম সওয়ারী দুটি তালেরই মাত্রা সংখ্যা পনের, বিভাগও চারটি কিন্তু গজরুম্পার প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ ভাগ 818 মায়ার এবং তৃতীয় ভাগ মাত্রা। পক্ষান্তরে পঞ্চম সওয়ারীর প্রথম ভাগটি ৩ মাত্রার, অবশিষ্ট তিনটি ভাগ ৪ ৪ মাত্রার।

এই পদ্ধতির প্রত্যেকটি তালের জন্য পৃথক-পৃথক বোল বা বাণী দিয়ে ঠেকা রচিত হয়েছে। প্রত্যেকটি বিভাগ বোঝাবার জন্য, সম, তালি খালি ইত্যাদির ব্যবস্থা আছে। তবে কতগুলি তালের ব্যাপারে মতানৈক্যও আছে গুণীজনদের মধ্যে। যেমন মত্ততাল । কেউ মানেন ১ মাত্রা, কেউ ১৮ মাত্রা। বিভাগ ও বোল নিয়েও মতপার্থক্য আছে । যৎ-কে কেউ বলেন ৮, কেউ মানেন ১৬ মাত্রা। বিলম্বিত একতালকে আজকাল কেউ বলেন ৪৮ মাত্রা, কেউ বলেন ২৪, কেউ বলেন ১২। ঝুমরাকে কেউ মানেন ৫৬ মাত্রা, কেউ ২৮, কেউ বা ১৪ মাত্র। ক্ষুদ্রতালকে ১১, ১৫, ১৬, ও ১৭ মাত্রায় সজ্জিত হতেও দেখা যায়। এইভাবে ব্ৰহ্মতাল, লক্ষক্ষ্মীতাল, অর্জনেতাল প্রভৃতি নিয়েও মতান্তর আছে ।

 

ভারতীয় সঙ্গীতে প্রচলিত পৃথক তাল পদ্ধতি
ভারতীয় সঙ্গীতে প্রচলিত পৃথক তাল পদ্ধতি

 

দক্ষিণী বা কর্ণাটকা তাল পদ্ধতি

হিন্দুস্থানী পদ্ধতিতে যেমন বহু রকমের তাল আছে, কণটিক পদ্ধতিতে তেমনি ১০৮ রকমের তাল পাওয়া যায়। অবশ্য বর্তমানে মাত্র পরত্রিশটি তালই প্রচলিত। এই পয়ত্রিশটি তালের মধ্যে মুখ্য তাল হল সাতটি। এবে, মঠ, রূপক, ঝম্প, ত্রিপটে অঠ ও একতাল। এই তালগালির প্রত্যেকটির পাঁচটি ক’রে জাতি আছে। সেই পঞ্চজাতির নাম হ’ল: চত, বিস্র, মিশ্র, খন্ড ও সংকীর্ণ জাতি।

এক-একটি তাল যেমন পাঁচটি বিভিন্ন জাতিতে বিভন্ন হয়ে মোট পারিশটি ভাল হবে, তেমনি প্রত্যেকটি ডালেরই আবার অঙ্গনে আছে। মোট ছ’টি অঙ্গের মধ্যে আজকাল মাত্র তিনটি অঙ্গই কাজে লাগানো হয়।

প্রত্যেকটি অঙ্গের মাত্রার পরিমাণ ভিন্ন পথক-পৃথক চিহ্ন দিয়ে অঙ্গগুলির মাত্রার পরিমাণ বোঝানো হয়। যেমন-

ভারতীয় সঙ্গীতে প্রচলিত পৃথক তাল পদ্ধতি

 

এখানে আরেকটি কথা মনে রাখতে হবে। যদিও লঘুর পরিমান ৪ মাত্রা বলা হয়েছে, কিন্তু জাতিভেদে তা’র মাত্রা সংখ্যার তারতম্য ঘটে। চিহ্ন অবশ্য একই থাকে । যেমনঃ চতন্ত্র জাতিতে লঘর মাত্রা যদি ৪ হয়, তিস্ল, জাতিতে লঘর মাত্রা হয়ে যাবে ৩, মিশ্র জাতিতে ৭. খণ্ড জাতিতে ৫ এবং সংকীর্ণ জাতিতে হবে ৯ মাত্রা ।

এবার নিচের তালিকাটি দেখুন, কি ভাবে কণটিক পদ্ধতিতে তাল লেখা হয় এবং জাতিভেদে লঘুর পরিমাণ বদলে যায় । —

 

ভারতীয় সঙ্গীতে প্রচলিত পৃথক তাল পদ্ধতি

 

নিশ্চয়ই বুঝেতে পাচ্ছেন যে তালচিহ্ন এক রকম থাকা সত্বেও জাতি তফাতে কেবল মাত্র লঘর মাত্রা-সংখ্যা বদলে যাচ্ছে। কিন্তু চিহ্নের কোন বদল হচ্ছে না ।

 

ভারতীয় সঙ্গীতে প্রচলিত পৃথক তাল পদ্ধতি

 

ভারতীয় সঙ্গীতে প্রচলিত পৃথক তাল পদ্ধতি

 

ভারতীয় সঙ্গীতে প্রচলিত পৃথক তাল পদ্ধতি

 

ভারতীয় সঙ্গীতে প্রচলিত পৃথক তাল পদ্ধতি

 

ভারতীয় সঙ্গীতে প্রচলিত পৃথক তাল পদ্ধতি

 

ভারতীয় সঙ্গীতে প্রচলিত পৃথক তাল পদ্ধতি

 

উপরোক্ত তাললিপি থেকে আরেকটি বিষয় আমরা জানতে পাচ্ছি যে এই পদ্ধতিতে অঙ্গের চিহ্ন থেকেই বিভাগ বোঝা যায়। বিভাগের জন্য উত্তরী পদ্ধতির মত দণ্ড বা দাঁড়ি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না ।

হিন্দুস্তানী পদ্ধতিতে যেমন প্রত্যেকটি ভাল বিভাগের প্রথম মাত্রার ওপর তালি কিংবা খালি দেখাবার জন্য যথাক্রমে হাততালির আঘাত এবং অনাঘাতের সাহায্য নেওয়া হয়, দক্ষিণীতেও তেমনি হাতের সাহায্য নেওয়া হয়, তবে ভিন্ন ভাবে। এই পদ্ধতিতে কোন ফাক নেই—সবই তালি বিভাগীয় পার্থক্য বোঝাবার জন্য প্রতি বিভাগের প্রথম মাত্রার তালি দেবার পর অবশিষ্ট মাত্রাগগুলিকে দেখানো হয় বিশেষ ভাবে হাত নেড়ে—যে- ক্রিয়াকে বলা হয় ‘সিজি’তম’।

তিন রকম বিসর্জিতম আছে। (১) পতাকা বিসর্জিতম হাত ওপর দিকে তুলে মাত্রার হিসেবে রাখা হয়। (2) বিসর্জিতম ডান দিকে হাত দোলানো হয়। (0) কৃষয় বিসর্জিতম বাঁ দিকে হাত হেলানো হয়। কোনো বিভাগ যদি একমাত্রার হয় অর্থাৎ ‘অনতে’ হয়, তাহলে বিসর্জিতম-এর কোন ক্রিয়া থাকবে না। একাধিক মাত্রার বিভাগ হ’লে, অর্থাৎ ‘প্রতে’ হলে, প্রথম মাত্রার তালি দিয়ে পরের মাত্রায় বিসর্জ তমা দেখাতে হবে।

দক্ষিণী পদ্ধতিতে উত্তরী তাল লেখার নিয়ম

উভয় পদ্ধতির ভাল জেনে নেবার পর, এখন যদি আমাদের দক্ষিণী পতিত উত্তরী পদ্ধতির তাল লিপিবদ্ধ করতে বলা হয়, তাহলে নিশ্চয়ই আর কোন অসুবিধে আমাদের হবে না। একটি তাল ননা স্বরূপে দেখা যেতে পারে।

 

ভারতীয় সঙ্গীতে প্রচলিত পৃথক তাল পদ্ধতি

Leave a Comment