আজকের আলোচনার বিষয়ঃ নৃত্যশিল্পী বিন্দাদীন

নৃত্যশিল্পী বিন্দাদীন
কালিকা-বিন্দাদীন ভ্রাতৃদ্বয়ের নাম শোনেননি সঙ্গীত জগতে এমন অজ্ঞতা বোধহয় করো নেই। এই যুগলবন্দী নামে তাঁরা ভারতজোড়া প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। এদের আসল নাম ছিল যথাক্রমে কালিকাপ্রসাদ ও বৃন্দাবন- প্রসাদ। কালিকার নাম আগে ব্যবহৃত হ’ত বলে কিন্তু কেউ ভাববেন না যে তিনি বিদাদীনের চাইতে বড় ছিলেন। বিদাদীনের সর্বকনিষ্ঠ ভাইয়ের নাম ভৈরো প্রসাদ। আনমোনিক প্রায় ১৮২৯ কিংবা ৩০ খৃষ্টাব্দে বিন্দাদীনের জন্ম। লখনৌ ঘরানার প্রবর্তক ঠাকুরপ্রসাদজী ছিলেন এর খুল্লতাত, মানে কাকা এবং পিতার নাম দুর্গাপ্রসাদ ।
অনেকে বলেন ইনি ঠাকুরপ্রসাদের পত্রে। কিন্তু পদ্মশ্রী শম্ভু মহারাজ নিশ্চয়ই তাঁর পিতামহের নাম ভুল করবেন না। হাধরাস থেকে প্রকাশিত “কথক নৃত্যে’ নামক গ্রন্থটি শম্ভু মহারাজ দেখেন নি এমনও হতে পারে না । তিনি ঐ গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেচেন, ” মহারাজ কালিকা-বিন্দাদীন ঘরানার সত্য ও প্রামাণিক ইতিহাস…এতে চিত্রসহ দেওয়া হয়েছে।”

বিন্দাদীন পরিবারের সকলেই নৃত্যকুশলী ছিলেন। তিনিও শৈশবকাল থেকেই তাঁর বাবা ও কাকার কাছে শিক্ষা শব্দ করেন। এরূপ জানা যায় যে, চার বছর পর্যন্ত নাকি একে শখে, “তিগ, দা দিগ্ দিগ — এই চারটি বোল মাত্র অভ্যাস করানো হয়েছে। এই কঠোর সাধনার ফল তাঁর কাছ থেকে পাওয়া গেচে মাত্র বারো বছর বয়সেই। কিশোর বয়সেই নবাব ওয়াজিদঅলি শাহের দরবারে প্রসিদ্ধ পাখোয়াজী কুদউ সিং-এর সঙ্গে তাঁর একবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বালক বিন্দাদনিই বিজয়ী হন। সঙ্গীতবিদ, বাদশাহ এই প্রতিভাধর বালকের লয়ের ক্ষিপ্রতায় বিস্মিত তথা সন্তুষ্ট হয়ে প্রচুর ধনরাশি পুরস্কার দিয়েছিলেন।
বিন্দাদীন খুব সাত্ত্বিক এবং অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন। শ্রীকৃষ্ণই ছিলেন তাঁর আরাধ্য দেবতা। মুসলমান বাদশাহের দরবারে নিযুক্ত থাকার জন্য মসলমানী ভাষা এবং বাদশাহী আদব-কায়দায় কেতাদুরস্ত হয়েও তিনি কখনো হিন্দ, সংস্কৃতি ও ধর্ম থেকে বিচ্যুত হননি। অসংখ্য বাঈজীদের সঙ্গে ওঠা-বসা করেছেন, অনেকেরই তিনি শিক্ষাগর, ছিলেন, কিন্তু কোনদিন তাঁর চরিত্র একটুকু ক্ষণ হয়নি। শিল্পীজীবনে এটা কম গৌরবের বিষয় নয় ।
বিন্দাদীন মহারাজ শখে, নৃত্যেই পারদর্শী ছিলেন না ঠুমরীতেও তাঁর অপরিসীম দক্ষতা ছিল। তিনি নাকি প্রায় দেড়হাজার ঠুমরী রচনা করেচেন । এই ঠুমরীর ভাবগলি নাতো প্রদর্শন করে প্রভাত যশ ও খ্যাতি তিনি অর্জন করেছিলেন। দেশবিদেশের বাঈজীরা তাঁর কাছে তালিম পাবার জন্য লালায়িত থাকতেন । কলকাতার বিখ্যাত গহরজান এবং পাটনার বিখ্যাত জোহরাবাঈ এর শিষ্যাদের অন্যতমা।
১৮৫৭ খৃষ্টাব্দে লক্ষো-এ যখন সিপাহী বিদ্রোহ হয় সেই সময় বিন্দাদীন মহারাজও যথেষ্ট ক্ষতিগ্ৰস্ত হ’ন। তাঁর ঘরবাড়ি ধন-সম্পত্তি এতে নষ্ট হয়ে যায় এবং তিনি কিছুকালের জন্য সপরিবারে লক্ষৌ পরিত্যাগ করেন। পরে অবশ। আবার লক্ষো-এ ফিরে আসেন এবং অপাজের নবাব ও নেপালের রাজার গান, কালো পনরায় তাঁর অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। বিন্দাদীন মহারাজ নিঃসন্তান ছিলেন। প্রায় ছিয়ানী (মতান্তরে অষ্টআশী ) বছর বয়সে দেহত্যাগ করেন ।
