আধুনিক নৃত্য ও তার বৈশিষ্ট্য

নৃত্য হলো মানুষের হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতির ছন্দময় বহিঃপ্রকাশ। বিশ্বজুড়ে সঙ্গীত ও নৃত্যকলাকে প্রধানত দুটি ধারায় ভাগ করা হয়—শাস্ত্রীয় ও লোকজ। শাস্ত্রীয় নৃত্য যেখানে কঠোর ব্যাকরণ ও নিয়ম-কানুন দিয়ে বদ্ধ, লোকনৃত্য সেখানে মাটির ঘ্রাণমাখা হৃদয়ের সরল উচ্ছ্বাস। তবে সময়ের সাথে সাথে মানুষের রুচি ও অভিজ্ঞতায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের নেশা আর নতুনত্ব খোঁজার ব্যাকুলতা থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘আধুনিক নৃত্য’ (Modern Dance)। এটি কেবল গতানুগতিক ছন্দের অনুসরণ নয়, বরং এটি সমকালীন মানুষের মনস্তত্ত্ব, বিদ্রোহ এবং স্বাধীনতার এক বলিষ্ঠ প্রতিফলন।

আধুনিক নৃত্য মূলত কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের বা শাস্ত্রের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। বিংশ শতাব্দী থেকে শুরু হওয়া এই নৃত্যধারায় আমরা দেখতে পাই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। উদয়শঙ্করের সৃজনশীল ‘প্রাচ্য নৃত্য’ (Oriental Dance) থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রবর্তিত ‘রবীন্দ্র নৃত্য’—সবই এই আধুনিকতার উজ্জ্বল উদাহরণ। প্রথাগত শাস্ত্রীয় মুদ্রাকে যখন আধুনিক জীবনবোধের সাথে মিলিয়ে উপস্থাপন করা হয়, তখনই তা নতুন এক আঙ্গিকে আমাদের সামনে ধরা দেয়। আধুনিক নৃত্যশিল্পীরা মনে করেন, শিল্প কখনও স্থবির হতে পারে না; বরং যুগোপযোগী পরিবর্তনের মাধ্যমেই তা টিকে থাকে।

যদিও শাস্ত্রীয় নৃত্যের পণ্ডিতরা অনেক সময় এই মিশ্রণ বা ‘পাঁচমিশেলী’ শৈলীকে সহজভাবে গ্রহণ করেন না, তবুও আধুনিক নৃত্যের আবেদন আজ বিশ্বজনীন। এর প্রধান শক্তি হলো এর লৌকিকতা এবং সমসাময়িক বিষয়বস্তু। যেখানে শাস্ত্রীয় নৃত্যে স্থায়ী ভাবের ওপর জোর দেওয়া হয়, সেখানে আধুনিক নৃত্য অনেক সময় তাৎক্ষণিক আবেগ এবং দৃশ্যকাব্য তৈরির মাধ্যমে দর্শককে মোহিত করে।

আজকের আলোচনায় আমরা আধুনিক নৃত্যের সেই বিবর্তনমুখী যাত্রা, এর বিভিন্ন প্রয়োগরীতি এবং শাস্ত্রীয় ও লোকনৃত্যের সাথে এর যে সূক্ষ্ম যোগসূত্র ও পার্থক্য রয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করব। শিল্পের এই অবারিত মুক্তি কীভাবে মানুষের সৃজনশীল প্রতিভাকে নতুন দিগন্তের সন্ধান দিচ্ছে, তাই হবে আমাদের আজকের মূল উপজীব্য।

 

আধুনিক নৃত্য ও তার বৈশিষ্ট্য

 

আধুনিক নৃত্য ও তার বৈশিষ্ট্য

শুধু ভারতেই নয়, বিশ্ব সংগীতকে দুটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। শাস্ত্রীয় সংগীত ও লোকসংগীত । একটি সংগীত-শাস্ত্রের জটিল নিয়ম কানুন দ্বারা বদ্ধ, অপরটি সরল হৃদয় থেকে উৎসারিত- যার মধ্যে নেই কোন নিয়ম-নিষেধের বাঁধন-কষণ। অর্থাৎ, একটি প্রধানত মস্তিষ্ক প্রসূত, অপরটি হৃদয়াবেগ থেকে সৃষ্ট। এই উভয় সংগীতই জন্ম নিয়েচে বিভিন্ন কালের মানুষের নিত্য চলমান মনের নানা অভিজ্ঞতা, নানা অনভূতি ও নানা পরিবর্তন থেকে। যার ফলে বিকশিত হয়েচে সংগীত কলার বিভিন্ন শৈলী ।

 

আধুনিক নৃত্য ও তার বৈশিষ্ট্য

 

সংগীতেরই একটি শাখা নত্যে। সংগীতের নানা ভাঙা-গড়ার মধ্য থেকে স্বাভাবিক নিয়মান,সারেই নাতোও এসেছে নানা পরিবর্তন। কথকলি, মণিপুরী, কথক প্রভৃতি যেমন শাস্ত্রীয় নৃত্যকলার নানা রূপভেদ : তেমন ভাঙড়া, গরবা, বনজোরা, ছৌ, রায়বেশে প্রভৃতি আঞ্চলিক লোকন তোর সংখ্যাও অসংখ্য ।

মানুষ বৈচিত্র্য প্রিয়। তাই এত বৈচিত্র্যের মধ্যেও তার মন তৃপ্তি পায় সে চঞ্চল হয়ে ওঠে আরো নতুনতর কোন বৈচিত্র্যের সন্ধানে। নিত্য ना। নতুন পরিবেশ, নতুন নতুন অভিজ্ঞতা তার মনে এনে দের নতুনত্বের উন্মাদনা। তার সন্ধানী মনে চমক দিয়ে যায় আরো নবীন কল্পনা- তার প্রকাশ ঘটে মানুষের সংজনশীল প্রতিভা সঞ্জাত রূপলোকে। আধুনিক কালের সংগীত, সাহিত্য, নাট্য, চিত্রকলা — সব কিছুরই মধ্যে আমরা অহরহ দেখতে পাই সেই নব নব উন্মেষের দীপ্তি।

 

আধুনিক নৃত্য ও তার বৈশিষ্ট্য

 

আধুনিক নৃত্য হল তেমনি আধুনিক প্রতিভার মানসিক সৃষ্টি। সাধারণ ভাবে ‘প্রাচ্য নৃত্য’ (ওরিয়েন্টাল ড্যান্স ), রবীন্দ্র নৃত্য, ভাবনত্য প্রভৃতি আধুনিক নৃত্যশৈলীর অন্তর্গত। কারণ, এগুলি আধুনিক কালের ভাবধারায় সৃষ্ট ও পষ্ট। এই আধুনিকীকরণের প্রেরণা এসেচে পাশ্চাত্ত্য থেকে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ভারতের শাস্ত্রীয় ও লোকন তোর বিক্ষিপ্ত প্রয়োগ যেমন এতে আছে, তেমনি পাশ্চাত্তোর প্রভাব থেকেও সে মত্ত নয় ।

 

বিভিন্ন শৈলীর মিশ্রণ ঘটানোর জন্য শাস্ত্রীয় নৃত্যবিদরা অনেকে এই পাঁচমিশেলী আধুনিক নাতাকে প্রীতির চক্ষে দেখেন না। তাঁদের মতে : এর শিল্পের আঙ্গিক (টেকনিক) অন্য শিল্পে ব্যবহার করা অন্যায়। তাঁরা মনে করেন, আশ, প্রয়োজনের খাতিরে চোখ ধাঁধাঁনোর উদ্দেশ্য পরিপূর্তির জন্য বে ক্ষণিক আনন্দ, যার দ্বারা স্থায়ী ভাবের সঞ্চার হয় না, তাকে উন্নত শ্রেণীর নতা বলা চলে না।

Leave a Comment