আজকের আলোচনার বিষয়ঃ হস্তক ও মুদ্রা

Table of Contents
হস্তক ও মুদ্রা
নৃত্যের সময় হাতের যে সব ভঙ্গি দ্বারা লয় ও ছন্দ বোঝানো হয়, তাকেই বলা হয় ‘হস্তক’। পক্ষান্তরে নৃত্যের সময় ভাবপ্রকাশের জন্য রচিত হাতের বিভিন্ন ভঙ্গির নাম ‘মুদ্রা’। ‘ন’ ও ‘নত্যে’ বিষয়ক আলোচনা আগে করা হয়েছে। মা সম্বন্ধে আরেক মতে বলা হয় : অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঞ্চালন দ্বারা যে ভাবব্যঞ্জক ভঙ্গিমা, তাকেই বলা হয় ‘মদ্র ।
এবার মদ্রা সন্বন্ধে আরেকটু বিশদ আলোচনা করা যাক। কারণ, মুদ্রা হ’ল নৃত্যের ভাষা। মদ্রা দিয়েই ননৃত্যশিল্পী তাঁর মনের ভাব ব্যক্ত করেন । প্রধানতঃ হাতের এমন কতগালি ভঙ্গি বা ক্লিয়া—যা’র দ্বারা মনোভাব প্রকাশ করা যায়, অধিকাংশ মতে তাকেই বলা হয় ‘মাদ্রা’। যেমন কেউ যদি ডান হাতের তর্জনীটি নিজের ঠোঁটের সামনে তুলে ধরে, তাহলে কারুরই বঝেতে অসুবিধা হবে না যে, এই ভঙ্গি বা ইঙ্গিতের দ্বারা চুপ করতে বলা হচ্ছে। এই ভঙ্গিটিই হ’ল মাদ্রা এবং এই মুদ্রাটিই হ’ল চুপ করতে বলার ভাষা-বিশেষ ।

মাদ্রার সংখ্যা ও প্রয়োগ বিধি নিয়ে শাস্ত্রকারদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা যায়। ভরতের ‘নাট্যশাদের মোট সাঁইত্রিশটি মনুধার উল্লেখ আছে। কিন্তু নন্দিকেশ্বরের ‘অভিনয়দপ’ণে’ দেওয়া হয়েছে মোট একান্নটি ।
সংখ্যা ও প্রয়োগ বিধির তারতম্য থাকলেও মদ্রার প্রকার নিয়ে কোন মতভেদ নেই । এর সর্ব সম্মত প্রকার দুটি— সংযত ও অসংযত। সংঘ, মানে দুটিকে এর সঙ্গে যুক্ত বা মিলিত করা। এখানেও সেই অর্থেই প্রযোজ্য।
দুই হাতের সংযোগে যে মুদ্রা রচিত হয় তাকে বলা হয় সংযুক্ত মুদ্রা । আর তার ঠিক বিপরীত অর্থাৎ এক হাতের মুদ্রাকে বলা হয় অসংযুক্ত মুদ্রা। নাট্যশাস্ত্রের মোট সাঁইত্রিশটি মুদ্রার মধ্যে সংযুক্ত মুদ্রার সংখ্যা তেরটি এবং অসংযুক্ত মুদ্রা চব্বিশটি। নাট্যশাস্ত্রের উভয় প্রকার মুদ্রার নাম দেখুন ।–

তেরটি সংযুক্ত (দুই হাতের মিলিত) মুদ্রার নাম –
অঞ্জলি, কপোত, কর্কট, স্বত্তিক, খটকাবর্ধমান, উৎসঙ্গ, নিষধ, ভোল (বা দোল ), পুষ্পপটে, মকর, গজদন্ত, অবহিথ ও বর্ধমান মুদ্রা।
চব্বিশটি অসংযুক্ত (এক হাতের ) মুদ্রার নাম –
পতাক, ত্রিপতাক, কর্তরীমুখী, অর্ধচন্দ্র, অরাল, শুকতুণ্ড, মুষ্টি, শিখর, কপিথ, ঘটকাম,খ, সচীব (বা ভ্যাস্য ), পদ্মকোশ, সপর্শীষ’, মগশীর্ষ’, কাংগল, অলপ ( বা অলপল্লব ), চতুর, ভ্রমর, হংসাসা, হংসপক্ষ, সদংশ, মকুল, ঊর্ণনাভ ও তাম্রচূড় ।
অশোক মল্ল বিরচিত নৃত্যাধ্যায়েও মুদ্রার সংখ্যা ভরতান,যায়ী কিন্তু কয়েকটি নামের সঙ্গে অমিল দেখা যায় ।
নন্দিকেশ্বরের মতে সংযজ্ঞে মদ্রার সংখ্যা তেইশ। ভরত অপেক্ষা দশটি বেশি। এই তেইশটির নাম দেখলেই উভয় মতের গরমিল বেশ স্পষ্ট বোঝা যাবে। উক্ত তেইশটি সংযত্ত মুদ্রার নাম । অঞ্জলি, কপোত, কক’ট, স্তম্ভিক, ডোলা, পপেটে, উৎসঙ্গ, শিবলিঙ্গ, কটকাবর্ধন, কত—রীস্বস্তিক, শকট, শঙ্খ, চক্র, সম্পট, পাশ, কলিক, মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, গড়, নাগবন্ধ, খটা ও ভেরাল্ড।
এই মতে অসংযত্ত মাদ্রার সংখ্যা আটাশটি, ভরত অপেক্ষা চারটি বেশি। এই অতিরিক্ত চারটির নাম ।। অর্থ পতাক, ময়ূর (বা ময়ূরাক্ষ), ত্রিশূল (রিলেক ) ও চন্দ্রকলা । তাছাড়া ভরত যে ঊর্ণনাভ মুদ্রার উল্লেখ করেছেন, অভিনয়দর্পণে ঐ নামটি নেই, তার বদলে আছে সিংহমখে।
ওপরে বর্ণিত ভরতোর সাঁইত্রিশটি ছাড়া আরো ত্রিশটি মাদ্রার নাম পাওয়া যায় নাট্যশাদের। সেগ লি নত্তের অন্তর্গত। সেগুলির নাম । চতুরষৌ, উদ বাত্তো, তাল, খৌ, স্বস্তিকা, অরাল ঘটকম; খোঁ, আবিশ্ববক্রো, সং চ্যাস্যো, তা, অতি উত্তানবঞ্চিত, পল্লব, নিতম্ব, কেশবন্ধ, লতাকর ( বা লতা (করিহন্ত, পক্ষবাতো, পক্ষপ্রদ্যোককৌ, দণ্ডপক্ষৌ, ঊর্ধ্বমণ্ডলীনে পার্শ্ব’ মণ্ডলীনৌ, ঊরোমমণ্ডলীনো, ঊরপার্শ্বধি’মণ্ডলৌ, মষ্টিক স্বস্তিকৌ, মদিনীপত্রকোণৌ, অলপত্রৌ (বা অল্পপল্লব ), উত্পণৌ, ললিতৌ, বলিতৌ, বিপ্রকীণেী ও গরুড়পক্ষকৌ। এই সাঁইত্রিশটি নাম,দ্রা (বা ন হন্তা ) আসলে নতো প্রদর্শনের সময় হাত নেড়ে মুদ্রাগুলির প্রয়োগভঙ্গি মাত্র। সেই জন্যই অনেক নত্যকার এগুলিকে পৃথক মুদ্রা মানেন না ।
মুদ্রাগুলি সবই ব্যবহারিক মানে ক্রিয়াত্মক (প্র্যাকটিকাল)।লিখে বা ছবি একে শব্ধে, নামগুলি ও চেহারা বোঝান যায় এবং পড়ে মুখেস্থও করা যায় কিন্তু এর রচনা কৌশল গ্রহের নিকট শিক্ষা সাপেক্ষ ।
কথক নাত্যের হাতের কাজ বা মদ্রার স্থান নিতান্তই গৌণ। এতে পায়ের কাজই বেশি। তবে নটবরী বা কথক নৃত্যে সচরাচর যে বংশীমুদ্রা, বংশী বাদন মুদ্রা, তাণ্ডব নৃত্যের সময় বিশাল ইত্যাদি মুদ্রা দেখানো হয়, উপরোক্ত মুদ্রা নামাবলীর মধ্যে তার কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না। কথক নৃত্যে এই ক’টি মুদ্রা অপরিহার্য’। य এমন হতে পারে যে, ভাষার পরিবর্তনের মত মুদ্রার নাম বা স্বরূপের মধ্যেও হয়ত অনেক পরিবর্তন ঘটেচে নানা কারণে অথবা মনের ভাব প্রকাশের জন্য স্বতঃস্ফূতভাবে যে মাদ্রাগগুলি সাধারণভাবে মানষে ব্যবহার করে, বোঝবার পক্ষে সহজ হবে মনে করেই হয়ত নতোকারেরা ঐ মদ্রার বহুল প্রচার করেচেন ।
