ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যকলার জগতে যে কয়েকটি শৈলী বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, তার মধ্যে ‘ভরতনাট্যম’ সর্বপ্রাচীন এবং শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে আসীন। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু থেকে উৎসারিত এই নৃত্যকলা কেবল একটি শৈল্পিক প্রদর্শন নয়, বরং এটি দেহ, মন ও আত্মার এক অনন্য সাধনা। ভাব, রাগ এবং তালের এমন অপূর্ব সমন্বয় বিশ্বের খুব কম শিল্প মাধ্যমেই খুঁজে পাওয়া যায়। অনেকের মতে, ‘ভা’-তে ভাব, ‘র’-তে রাগ এবং ‘ত’-তে তালের সমন্বয়েই এই নৃত্যের নামকরণ হয়েছে ‘ভরতনাট্যম’। আবার কেউ কেউ একে ভরত মুণির অমর সৃষ্টি হিসেবে গণ্য করেন।
ভরতনাট্যমের ইতিহাস মূলত ধর্মীয় আচারের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। একসময় দক্ষিণ ভারতের সুউচ্চ মন্দিরগুলোতে দেবতাকে উৎসর্গ করে দেবদাসীরা এই নৃত্য পরিবেশন করতেন, যা তৎকালীন সময়ে ‘সাদির নাট্যম’ নামে পরিচিত ছিল। উত্তর ভারতে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক ধ্রুপদী সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দক্ষিণ ভারতের স্থানীয় রাজন্যবর্গ এবং দেবদাসী সম্প্রদায়ের একনিষ্ঠ প্রচেষ্টায় ভরতনাট্যম তার প্রাচীন বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। এটি মূলত একটি আধ্যাত্মিক শিল্প, যেখানে প্রতিটি মুদ্রা ও প্রতিটি পদবিক্ষেপ এক একটি বিশেষ অর্থ বহন করে।
ভরতনাট্যমকে বলা হয় ‘চাক্ষুষ কাব্য’। দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন মন্দিরগাত্রে খোদাই করা পাথরের মূর্তিতে এই নৃত্যের অসংখ্য মুদ্রার প্রতিফলন দেখা যায়। এই শৈলীটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং নাট্যশাস্ত্রের কঠোর নিয়ম মেনে পরিচালিত হয়। বর্তমান সময়ে আমরা ভরতনাট্যমে যে সাতটি সুবিন্যস্ত ধাপ—অলারিপু থেকে শ্লোকম পর্যন্ত দেখি, তা তাঞ্জোরের বিখ্যাত চার ভাতৃদ্বয়ের এক কালজয়ী অবদান।
আজকের আলোচনায় আমরা ভরতনাট্যম নৃত্যশৈলীর সেই সুপ্রাচীন ইতিহাস, এর বিভিন্ন কৌশলগত দিক এবং আধ্যাত্মিক গভীরতা নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করব। কণ্ঠসঙ্গীত, বাদ্যযন্ত্র এবং মুদ্রার জাদুকরী ছোঁয়ায় কীভাবে এই নৃত্যশৈলী দর্শককে লৌকিক জগৎ থেকে অলৌকিক আনন্দের স্তরে নিয়ে যায়, সেই রহস্যই উন্মোচিত হবে এই নিবন্ধে।

ভরতনাট্যম নৃত্যশৈলী
দক্ষিণ ভারতীয় নৃত্যশৈলী ‘ভরতনাট্যম’-কে ভারতীয় নৃত্যকলার সর্বশ্রেষ্ঠ রূপায়ণ বলে চিহ্নিত করা হয়।
এই নৃত্যশৈলীর উৎপত্তি সম্বন্ধে নানা মুনির নানা মত । যেমন, কোন মতে এটি ভরত মুনির সৃষ্টি, তাই এর নাম ভরতনাট্যম । ভিন্ন মতে ভাব, রাগ ও তাল – এই তিন বিষয়ের প্রথম তিনটি বর্ণের ( ভ+র+ত ) সমন্বয়ে এর নাম রাখা হয়েচে ভরতনাট্যম। কারণ এই তিনটি বস্তুই ভরতনাট্যমে প্রযুক্ত হয় । আবার আরেক মতে, ভারতের প্রাচীন শাস্ত্রীয় নিত্য হিসেবে এর নাম ভরতনাট্যম ।
কোন কোন জায়গায় ভরতনাট্যমকে ভারতনাট্যম নামে অভিহিত করা হয়। কথাটা কিন্তু আসলে ভরতনাট্যম, ভারতনাট্যম নয়।
ভরতনাট্যম শুধু দক্ষিণ ভারতীয় নৃত্যশৈলীই নয়, সর্ব ভারতীয় নৃত্য। একদা সারা উত্তর ভারতেই এই নতো প্রচলিত ছিল। রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে উত্তর ভারতের সংস্কৃতি যখন বিপন্ন, ভরতনাট্যমের প্রগতি ব্যাহত হয় সেই সময় থেকে অবশিষ্ট যা রইল, তারও মধ্যে অন; প্রবেশ করল বিদেশী প্রভাব। কিন্তু দক্ষিণ ভারতে প্রচলিত ভরতনাট্যম এই বিপর্য’য় থেকে অনেকাংশে অব্যাহতি পেয়েছিল। তাই তার মধ্যে প্রাচীন রীতি বর্তমান রইল। তাছাড়া স্থানীয় রাজন্যবর্গের অনগ্রহের জন্যও এই ধর্মভিত্তিক নৃত্যধারার প্রগতি প্রায় সমান ভাবেই এগিয়ে চলছিল ।

ভারতবাসীরা ডাকসাইটে ধর্মভীর, জাতি। তাই তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যেকোন আচার ব্যবহার বা কলাবিদ্যার সঙ্গেই ধর্ম জড়িয়ে রয়েে অঙ্গাঙ্গি ভাবে। সঙ্গীত কলাতেও তার প্রভাব পড়েছে স্বাভাবিক ভাবেই । দেবতাদের পরিতৃপ্ত করার জন্য সঙ্গীত ব্যবহৃত হ’ত। যার অন্যতম প্রমাণ নিহিত আছে দেবদাসী প্রথার মধ্যে ভারতের সমস্ত প্রান্তীয় মন্দিরেই এক সময় দেবদাসী সম্প্রদায় নৃত্যগীত দ্বারা দেবতাদের প্রসন্ন করতেন । দেবদাসীরা যে শৈলীর নতে। করতেন, তারই নাম ভরতনাট্যম।
উত্তর ভারতে প্রচলিত ভরতনাট্যমের জাত নষ্ট হলেও, দক্ষিণ ভারতের দেবদাসী এবং রাজন্যবর্গের প্রচেষ্টা ও পৃষ্ঠপোষকতা ভরতনাট্যমকে তার পূর্বে বৈশিষ্ট্যগুলি সম্পূর্ণে ভাবে নষ্ট হতে দেয়নি। অবশ্য পরবর্তী কালে দক্ষিণ প্রাপ্তীয় নতোবৈশিষ্ট্যের কিছু মিশিয়ে একে আরো সমৃদ্ধ করা হয়েছে।
ভরতনাট্যম যে ভারতের প্রাচীনতম নৃত্য, তার বহু প্রমাণ আছে। হিন্দী ভাষায় রচিত ‘নভো ভারতী প্রণেতা আচার্য সুধাকর বলেচেন “দক্ষিণ ভারতের পূর্ব” ভাগে ইহা ( ভরতনাট্যম) প্রচলিত। এই নত্য ভরতনাট্যশাস্ত্রের অধিকাংশ লক্ষণের সঙ্গে যুক্ত। তথাপি নাট্যশাস্ত্রে বর্ণিত কয়েকটি মূল তত্ত্ব এতে অনুপস্থিত। পদ সঞ্চালনের অনেক ক্রিয়া এই শৈলীতে আছে। তঙ্গেরও অনেক ক্লিয়া অবশ্যই আছে যার দ্বারা নাট্যশাস্ত্রের বর্ণনা বোঝা যায়। নাট্যশাস্ত্রের মধ্যে ‘করণ’-এর অভাব এতে আছে এবং এই জন্যই ‘অঙ্গহার’ও হতে পারে না। কারণ অঙ্গহার ‘করণ’ থেকেই রচিত হয়। মদ্রার সংখ্যা অনেক কম। অভিনয়-অঙ্গ সুন্দর, কিন্তু অর্চনা ও শজার পর্যন্তই তা সীমিত ”

ভরতনাট্যম নৃত্য বর্তমানে সাধারণতঃ যে সাতটি রীতি প্রদর্শিত হয়, সেই অলারিপ,, যতিরম, শব্দম, বর্ণ’ম, পদম। ভিল্লানা ও শ্লোকম এগুলি পরবর্তী কালের অবদান। তাঞ্জোরের রাজা সারফোজির পষ্ঠপোষকতায় নৃত্যবিদ, চিন্নইয়া, পমেইয়া, শিবানন্দম ও ওয়াড়িভেল নামক চার ভাই এই রীতিগুলির প্রবর্তক । তার আগে ভরতনাট্যম বলতে বোঝাত সাদিরনাট্যম, ভগবতমেলা নাটক, কুর ভাজি ও কুচিপড়ি নাত্যরীতি।
কণ্ঠসঙ্গীত এই নৃত্যের একটি প্রধান অঙ্গ। কণ্ঠসঙ্গীতে রাগ-রাগিণী ব্যবহৃত হয় এবং তানপুরা, বীণা, সুরঙ্গার, সারঙ্গী, বেহালা, বাঁশী, নাগেশ্বরম, করতাল মন্দিরা, মৃদঙ্গম প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রগুলি এর আবহসঙ্গীত রচনা করে। সাধারণত এতে নয়টি তাল ব্যবহৃত হয়, যা বিভিন্ন মাত্রা ও যতিতে বিভক্ত ।
আঙ্গিক, বাচিক, সাত্ত্বিক ও আহার্য– এই চার প্রকার অভিনয়ই এই নিত্যশৈলীতে প্রযুক্ত হয় । অন্যান্য বিষয়গুলি নিম্নরূপ।—
ধর্ম : দুই প্রকার। লোকধর্মী ও নাট্যধর্মী।
বৃত্তি : চার প্রকার ।—ভারতী সাত্ত্বতী, কৈশিকী ও আরভটি ।
সিদ্ধি : দুই প্রকার।—দৈবী ও মানুষী।
আসন : পাঁচ প্রকার ।—পদ্মাসনম সিংহাসনম, যোগাসনম বীরাসনম্ ও সিদ্ধাসনম্ ।
মণ্ডলা : চার প্রকার। মণ্ডলা, অর্ধ মণ্ডলা ও নত্যমণ্ডলা ।
পাদবিক্ষেপ : তিন প্রকার। অগ্নিতা, কুঞ্চিতা ও অর্ধণ্ডিতা।
ভঙ্গি : তিন প্রকার । —সম, ললিতা ও বলিতা।
অঙ্গভেদ : তিন প্রকার ।—করণ, অঙ্গহার, ও মুদ্রা।
