ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের বিশাল মহীরুহ মূলত দুটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—একটি হলো বীরত্ব ও শৌর্যের প্রতীক ‘তাণ্ডব’, অন্যটি হলো প্রেম ও কমনীয়তার মূর্ত রূপ ‘লাস্য’। সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকেই এই দুই বিপরীতমুখী অথচ পরিপূরক ধারার মাধ্যমে ব্রহ্মাণ্ডের ভারসাম্য ও মানবিক অনুভূতির চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে আসছে। মহাদেব শিব এবং দেবী পার্বতীর মাধ্যমে প্রবর্তিত এই দুটি শৈলী কেবল শারীরিক কসরত নয়, বরং এটি এক গভীর আধ্যাত্মিক দর্শন।

Table of Contents
তাণ্ডব ও লাস্য
১. তাণ্ডব ও লাস্যের শাস্ত্রীয় প্রেক্ষাপট
ভারতীয় অলঙ্কার শাস্ত্র ও সঙ্গীত পণ্ডিতদের মতে, তাণ্ডব ও লাস্যের ধারণা সময়ের সাথে সাথে বিবর্তিত হয়েছে। মহর্ষি ভরত তাঁর অমর সৃষ্টি ‘নাট্যশাস্ত্র’-এ আদিম অবস্থায় এই দুই ধারাকে খুব বেশি পৃথক করেননি। তিনি তাণ্ডবকে শৃঙ্গার রসের একটি অংশ হিসেবেও দেখেছিলেন, যা সুকুমার ও লীলায়িত গীতের মাধ্যমে পরিবেশিত হতো। তবে পরবর্তীকালের পণ্ডিতেরা এই দুই শৈলীকে সম্পূর্ণ পৃথক বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত করেছেন।
পণ্ডিতদের মতে:
নন্দিকেশ্বর (অভিনয়দর্পণ): তাঁর মতে, যে নৃত্যের করণ ও অঙ্গহারগুলি উদ্ধত এবং যে বৃত্তি ‘আরভট্টি’ (বীরত্বপূর্ণ), তাকেই ‘তাণ্ডব’ বলা হয়।
শার্ঙ্গদেব (সঙ্গীত রত্নাকর): তিনি অঙ্গহারের উন্নত ও শক্তিশালী প্রয়োগকে ‘তাণ্ডব’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
ধনঞ্জয় (দশরূপক): তিনি খুব সহজভাবে এর পার্থক্য করে বলেছেন—উদ্ধত বা বীরত্বব্যঞ্জক নৃত্য হলো ‘তাণ্ডব’ এবং কোমল বা সুকুমার নৃত্য হলো ‘লাস্য’।

২. তাণ্ডব নৃত্য: শক্তির উদ্দাম মহিমা
তাণ্ডব শব্দটি এসেছে শিবের অনুচর ‘তণ্ডু’ মুণির নাম থেকে। মহাদেব শিব যখন মহাপ্রলয়ের উন্মাদনায় কিংবা বিজয়ের আনন্দে নৃত্য করেন, তখন তাকেই তাণ্ডব বলা হয়। এর প্রধান রসসমূহ হলো বীর, রৌদ্র, বীভৎস ও ভয়ানক।
তাণ্ডবের বৈশিষ্ট্যসমূহ:
অঙ্গহার ও করণ: তাণ্ডব নৃত্যে এমন সব শারীরিক ভঙ্গি বা অঙ্গহার থাকে যা অত্যন্ত শক্তিশালী ও কঠিন। এতে পা ও হাতের চলন দ্রুত এবং বলিষ্ঠ হয়।
পুরুষালি আবেদন: এটি মূলত পুরুষদের জন্য প্রযোজ্য নৃত্যশৈলী। কারণ এর অঙ্গ সঞ্চালনা অত্যন্ত শ্রমসাধ্য এবং এতে যে তেজ ও গাম্ভীর্য থাকে, তা পুরুষালি ব্যক্তিত্বের সাথে মানানসই। তবে আধুনিক যুগে নারী নর্তকীরাও এই কঠোর শৈলী সাফল্যের সাথে প্রদর্শন করছেন।
নৃত্য ও নৃত্তের সমন্বয়: তাণ্ডবে কেবল কাহিনী প্রকাশ নয় (নৃত্য), বরং ছন্দ ও লয়ের জটিল অংকও (নৃত্ত) সমানভাবে বিদ্যমান।
তাণ্ডবের প্রকারভেদ:
‘সঙ্গীত দামোদর’-এর মতে তাণ্ডব দুই প্রকার: ১. পেবলি: কোনো বিশেষ অভিনয় ছাড়া কেবল শারীরিক অঙ্গবিক্ষেপ ও ছন্দের বাহুল্যে যে নৃত্য প্রদর্শিত হয়। ২. বহুরূপ: যেখানে শারীরিক কারুকাজের পাশাপাশি নানা প্রকার আঙ্গিক অভিনয় ও কাহিনীর বহিঃপ্রকাশ থাকে।
আবার ভিন্ন মতে তাণ্ডবকে তিনটি তীব্রতায় ভাগ করা হয়— চণ্ড, প্রচণ্ড এবং উচ্চণ্ড। পুরাণে মহাদেবের সাতটি ভিন্ন রূপের তাণ্ডবের উল্লেখ আছে, যার মধ্যে ‘আনন্দ তাণ্ডব’ এবং ‘রুদ্র তাণ্ডব’ সর্বাধিক পরিচিত।

৩. লাস্য নৃত্য: লাবণ্যের নন্দনতত্ত্ব
লাস্য নৃত্যের প্রবর্তিকা হিসেবে মনে করা হয় দেবী পার্বতীকে। শিবের উদ্দাম তাণ্ডবের বিপরীতে জগতের কোমলতা, সৌন্দর্য ও প্রেমকে টিকিয়ে রাখার জন্য পার্বতী লাস্য সৃষ্টি করেছিলেন। এর প্রধান রস হলো শৃঙ্গার ও করুণ।
লাস্যের বৈশিষ্ট্যসমূহ:
কোমলতা ও কমনীয়তা: লাস্যের প্রধান সম্পদ হলো শিল্পীর লাবণ্য। এতে মুদ্রার ব্যবহার অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং ভ্রু-পল্লব ও চোখের কাজ খুব নিপুণ হয়।
নারীসুলভ অভিব্যক্তি: লাস্যকে প্রধানত নারীদের নৃত্য বলা হয়। এর ‘আঙ্গিকাভিনয়’ অত্যন্ত মধুর এবং লয় সাধারণত মধ্য বা ধীর হয়ে থাকে।
ভাবের প্রাধান্য: লাস্যে কাহিনীর চেয়ে হৃদয়ের আবেগ বা ‘স্থায়ী ভাব’ বেশি গুরুত্ব পায়।
লাস্যের প্রকারভেদ:
‘সঙ্গীত দামোদর’-এর উক্তি অনুযায়ী লাস্য দুই প্রকার: ১. যৌবত (সমবেত): উত্তম পরিচ্ছদ ও অলঙ্কারে সজ্জিত হয়ে নর্তকীদের একটি দল যখন মনোহারী রূপে নৃত্য পরিবেশন করে। ২. ছুরিত (দ্বৈত): যেখানে নায়ক ও নায়িকা মিলে অভিনয়, প্রেম ও ভাবের আদান-প্রদানের মাধ্যমে নৃত্য সম্পন্ন করেন। একে আধুনিক ভাষায় ‘ডুয়েট’ বা দ্বৈত নৃত্য বলা চলে।
৪. তাণ্ডব ও লাস্যের মনস্তাত্ত্বিক ও শৈল্পিক বিশ্লেষণ
মানুষের মনের দুটি দিক আছে—একটি সংহারী ও তেজস্বী, অন্যটি সৃজনশীল ও মমতাময়। তাণ্ডব মানুষের সেই তেজস্বী সত্তাকে জাগ্রত করে। এটি যখন মঞ্চে পরিবেশিত হয়, তখন দর্শক ও শিল্পীর মধ্যে এক ধরনের বীরত্বব্যঞ্জক শক্তির সঞ্চার ঘটে। রণসঙ্গীত বা মার্গ সঙ্গীত এই পর্যায়ের অন্তর্গত।
অন্যদিকে, লাস্য মানুষের মনে প্রশান্তি ও ভালোবাসার উদ্রেক ঘটায়। ভরতনাট্যম বা ওড়িশী নৃত্যের অনেক ক্ষেত্রে আমরা লাস্যের চরম বিকাশ দেখতে পাই। নটবরী বা কৃষ্ণলীলা ভিত্তিক নৃত্যগুলোতে লাস্যের উপস্থিতিই প্রধান।
৫. আধুনিক নৃত্যে প্রয়োগ ও সমন্বয়
বর্তমান যুগে বিশুদ্ধ তাণ্ডব বা বিশুদ্ধ লাস্যের চেয়ে এই দুইয়ের চমৎকার সমন্বয় বেশি দেখা যায়। যেমন কথাকলি নৃত্যে যখন কোনো বীর বা অসুর চরিত্র মঞ্চে আসে, তখন সেখানে তাণ্ডবের আধিক্য থাকে। আবার যখন নারী চরিত্র বা প্রেমের দৃশ্য আসে, তখন লাস্যের ছোঁয়া লাগে।
আধুনিক নৃত্যবিদদের মতে, তাণ্ডব ছাড়া লাস্য যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি লাস্য ছাড়া তাণ্ডব কেবল শুষ্ক শরীর চর্চা। শিব ও শক্তি যেমন অবিচ্ছেদ্য, তাণ্ডব ও লাস্যও তেমনি ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যের এক অখণ্ড সত্তা।

পরিশেষে বলা যায়, তাণ্ডব ও লাস্য কেবল দুটি পৃথক নৃত্যপদ্ধতি নয়, বরং এটি জীবনের দ্বান্দ্বিক বাস্তবতার প্রতিফলন। মহাবিশ্বের যে বিনাশ ও সৃষ্টি—তা এই দুই নৃত্যের ছন্দে বাঁধা। তাণ্ডব আমাদের শেখায় নিয়ম ও সংহতি, আর লাস্য আমাদের দান করে সৌন্দর্য ও লাবণ্য। ভারতের প্রতিটি শাস্ত্রীয় নৃত্যশৈলী—তা সে মণিপুরী হোক বা ভরতনাট্যম—এই দুই ধারার ওপর ভিত্তি করেই নিজস্ব স্বকীয়তা অর্জন করেছে। প্রকৃত শিল্পীর সাধনা হলো এই বীরত্ব আর লাবণ্যের ভারসাম্য রক্ষা করা, যা দর্শককে পৌঁছে দেয় এক অলৌকিক রসের স্বর্গে।
