ভারতের ওড়িশা রাজ্যের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাচীন কলিঙ্গ সভ্যতার এক অনন্য শৈল্পিক উত্তরাধিকার হলো ‘ওড়িশী’ নৃত্য। এটি কেবল একটি শাস্ত্রীয় নৃত্যশৈলী নয়, বরং পাথরের গায়ে খোদাই করা হাজার বছরের প্রাচীন স্থাপত্যের এক জীবন্ত রূপ। ভুবনেশ্বরের উদয়গিরি পাহাড়ের খণ্ডগিরি গুহা থেকে শুরু করে কোণার্কের সূর্য মন্দির কিংবা পুরীর জগন্নাথ মন্দির—প্রতিটি মন্দিরগাত্রে নৃত্যরতা যে অপরূপ শিলামূর্তিগুলি আমরা দেখি, ওড়িশী নৃত্য হলো সেই স্থির মূর্তির চলিষ্ণু রূপায়ণ। প্রাচীনত্ব এবং শাস্ত্রীয় বিশুদ্ধতার বিচারে এই নৃত্যশৈলী ভারতীয় সংস্কৃতির এক অমূল্য রত্ন।
ওড়িশী নৃত্যের প্রাণপ্রবাহ সচল ছিল মন্দিরের সেবায় উৎসর্গীকৃত ‘মাহারী’ বা দেবদাসীদের মাধ্যমে। পুরীর শ্রীজগন্নাথের মন্দিরে দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য তাঁরা একনিষ্ঠভাবে এই নৃত্য পরিবেশন করতেন। মাহারীদের এই নৃত্য ছিল একান্তই সাত্ত্বিক এবং আধ্যাত্মিক। কালক্রমে যখন এই ধারা মন্দির থেকে রাজসভায় পৌঁছাল, তখন এর মধ্যে কিছু পরিবর্তন আসে। পরবর্তীতে কিশোর বালকদের দ্বারা পরিবেশিত ‘গটিপুয়া’ নৃত্যের মাধ্যমে ওড়িশী সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। যদিও ব্রিটিশ শাসনামলে এবং সামাজিক বিবর্তনে এই নৃত্যশৈলী বিলুপ্তির পথে বসেছিল, তবুও পঙ্কজচরণ দাস, কেলুচরণ মহাপাত্রের মতো মহান গুরুদের সাধনায় তা পুনরায় বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ওড়িশী নৃত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘ত্রিভঙ্গ’ মুদ্রা—যেখানে শরীর তিনটি বাঁকে (মাথা, ধড় এবং হাঁটু) বিভক্ত হয়ে এক অপূর্ব লালিত্য সৃষ্টি করে। এটি মূলত ‘লাস্য’ বা নারীসুলভ কোমলতার নৃত্য হিসেবে পরিচিত হলেও এর মধ্যে ‘তাণ্ডব’ বা বীরত্বের গাম্ভীর্যও বিদ্যমান। জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’-এর সুললিত পদাবলী এই নৃত্যের প্রধান উপজীব্য। মঙ্গলাচরণ থেকে শুরু করে স্বরপল্লবী এবং সবশেষে মোক্ষ বা আনন্দ নৃত্যের মধ্য দিয়ে ওড়িশী শিল্পী দর্শককে এক অপার্থিব প্রশান্তির জগতে নিয়ে যান।
আজকের আলোচনায় আমরা ওড়িশী নৃত্যের সেই সুপ্রাচীন ইতিহাস, দেবদাসী ও মাহারী সম্প্রদায়ের অবদান এবং এর কারিগরি ও শাস্ত্রীয় দিকগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করব। অবহেলা ও বিস্মৃতি কাটিয়ে কীভাবে এই নৃত্য আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, সেই জাদুকরী শিল্পযাত্রাই আমাদের আজকের মূল বিষয়।

ওড়িসী নৃত্য
প্রায় বছর-ষোল-সতেরো আগে ( আনুমানিক ১৯৬২-৬৩ খৃ.) পুরিতে গিয়েছিলাম—বেড়াতে নয়, পরীক্ষা নিতে । উড়িষ্যায় এই আমার প্রথম যাত্রা। শধু পারি নর। ভদ্রক ও ভুবনেশ্বরেও গিয়েছিলাম একই উদ্দেশ্যে। সেই সময় ওড়িসী নতোগর, শ্রীপঙ্কজচরণ দাসের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। প্রসঙ্গক্রমে তিনি দুঃখ ক’রে বললেন, প্রয়াগ সঙ্গীত সমিতি যখন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের শাস্ত্রীয় নাত্যকে তাদের পাঠ্যভুক্ত করেচে, তখন ওড়িসী নৃত্যেই বা কেন অবহেলিত থাকবে ? অনুরোধ করলেন, আমি যেন এ বিষয়ে একটু যত্নবান হই ।
বললাম, এই নৃত্যশৈলী সম্বন্ধে আমার কোনই ধারণা নেই। কখনো এ নাচ দেখিনি । কাজেই আমার পক্ষে এ নিয়ে কিছু বলা কি সমীচীন হবে ?—পঙ্কজবাব, তখন ভুবনেশ্বর ও পারিতে দুটি পৃথক নৃত্যোনঠোনের ব্যবস্থা করলেন । তার মধ্যে পারির অনংঠানটিই বিশেষভাবে প্রদর্শিত হয়েছিল। পঙ্কজবাব, নিজেও এতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর অন্য শিষ্যদের মধ্যে কুমারী সুষমা পট্টনায়ক ছিলেন অন্যতমা। এই অনষ্ঠানে কণ্ঠসঙ্গীতে অংশ গ্রহণ করেছিলেন স্থানীয় প্রবীণ সঙ্গীতগার, শ্যামসুন্দর সিঙ্গারী ও কাশীনাথ পাজাগণ্ডা, হরিহর থংটিয়া প্রভৃতি স্থানীয় খ্যাতিমান শিল্পীরা ।
অবাক হ’লাম। চমৎকৃত হ’লাম। সত্যিই এতটা আশা করিনি। নতা সম্বন্ধে আমার বিশেষ কোন জ্ঞান নেই। সেই স্বল্প জ্ঞানে মনে হল, শাস্ত্রে বর্ণিত অধিকাংশ নত্যমাত্রার ব্যবহার এতে হয়েছে। প্রযন্ত হয়েছে শাস্ত্রোন্ত করণ, অঙ্গহার প্রভৃতি। গতি ও পাদবিক্ষেপেও যথেষ্ট মাসিয়ানা পরিলক্ষিত হ’ল। পরিলক্ষিত হ’ল ভরতনাট্যমের প্রভাব। এক কথায়, যে-সব গণোবলিতে ভারতের অন্যান্য শাস্ত্রীয় নভোগলি সমৃদ্ধ, তার সব কিছুই এতে বিদ্যমান ।

আশ্চর্য হলাম ভেবে যে, এত গুণ থাকা সত্ত্বেও উড়িষ্যার বাইরে এতদিন এই নাতা কেন প্রচার লাভ করেনি। উড়িষ্যা সরকার কি কেবল রাজনীতিই করে এসেচে। তাদের দেশের এইরূপে একটি সাংস্কৃতিক সম্পদের সঙ্গে দেশ-বিদেশের মাননুষকে পরিচয় করাবার কোন প্রচেষ্টা করে নি। রাজনীতির অঙ্গ হিসেবে আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি বিনিময়ও তো চাল, হয়ে গেছে অনেকদিন। কোন দেশ বা জাতি যে তার কলাকৃতির মাধ্যমেই বেশি প্রতিফলিত হয়, উড়িষ্যা-সরকার কি সে বিষয়ে অবহিত নয় ?
পংকজবাবুকে কথা দিলাম— ওড়িসী নৃত্যকে সমিতির পাঠ্যান্তগতি করার চেষ্টা অবশ্যই করব। খুবেই আনন্দের বিষয়, আমার সে-চেষ্টা বিফল হয় নি। ওড়িসী নৃত্য অতঃপর সমিতির পাঠ্যতালিকাভুক্ত হয়েছে।
এরপর আমিও কৌতূহলী হ’লাম এ-বিষয়ে আরো কিছু জানার জন্য । ওড়িস নাতোর সঙ্গে দেবদাসীদের সম্পর্কও অনেক দিনের দেবদাসীদের বলা হত ‘মাহারী। পংকজবাবরা বংশ-পরম্পরায় এদের সঙ্গে মাদল সঙ্গত করতেন। বলেছিলেন, এই দেবদাসী বা মহার সম্প্রদায়ের মধ্যে কমনিসোরে কয়েকটি শ্রেণীবিভাগ ছিল। যাঁরা গান গাইতেন তাঁরা ছিলেন ‘গাউনী’ শ্রেণীভুক্ত, যাঁরা নতো করতেন তাঁদের বলা হ’ত, ‘নাচুনী’ ইত্যাদি।
স্ত্রীবেশে যে-পরষেরা নৃত্যগীত করতেন, তাঁদের বলা হাত ‘গটিপন”। দেবদাসীরা কোন পরষদের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারতেন না। অনষ্ঠানের দিন কোন পরষের সঙ্গে কথা বলাও ধারণ ছিল। বৈষ্ণবদের মত তাঁরা তিলক ও কণ্ঠী ধারণ করতেন। ভগবৎ সেবায় যখন মন্দিরে তাঁদের নত্যানষ্ঠান নিবেদিত হ’ত, পূজারী ও রাজা ছাড়া অন্য কারো সেখানে প্রবেশাধিকার ছিল না। দেবতার প্রতিনিধি রাজাদের মনে করা হয়।

দেবদাসীরা ছিলেন পুরোপুরী ভাবে দেবতায় উৎসর্গীকৃত প্রাণ। পতিতার প্রতিমূর্তি। দেবদাসী বৰ্ত্তি সে-সময় ছিল খুবেই মর্যাদাসম্পন্ন। সমাজে তাঁরা বিশেষ সম্মানীতা ছিলেন। রাজপরিবারের নারীরাও অনেকেই স্বেচ্ছায় এই বৃত্তি গ্রহণ করতেন বলে জানা যায় ।
যে জগন্নাথদেবের জন্য পরিধাম একটি প্রধান তীর্ণরূপে পরিণত, সেই শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কলিঙ্গরাজ চোড়গঙ্গদের (১০৭৭-১১৪৭ খৃ.)। ভারতের অন্যান্য জায়গার মত বিগ্রহ-বিনোদনের সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে তিনিই প্রথম এই মন্দিরে দেবদাসী নৃত্যের সূত্রপাত করেন ।
অবশ্য তার আগেও (সপ্তম শতাব্দীতে) কেশরী রাজমাতা কলাবতী প্রতিষ্ঠিত শিব মন্দিরে দেবসেবার উদ্দেশ্যে দেবদাসী বিনিয়োগের ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছিল। ভুবনেশ্বরের উদয়গিরিতে প্রাপ্ত একটি প্রস্তর-ক্ষোদিত ব্রহ্মলিপি থেকে জানা যায়, দ্বিতীয় খৃষ্টপবাদের কলিঙ্গরাজ খারবেল-এর সময়েও নাত্যগীতের যথেষ্ট সমাদর ছিল এবং রাজা নিজেও এই কলায় বিলক্ষণ কুশলী ছিলেন। এই সব থেকে গুড়িয়া নতো ও দেবদাসীদের প্রাচীনতা সম্বন্ধে ধারণা করা যেতে পারে । আরো জানা যায় যে, ভরতোত্তর কালে যাঁরা ভারতীয় নৃত্যকলার ধারক ও বাহক বলে কথিত, তাঁদের অন্যতম আচার্য অট্টহাস উড়িষ্যার বহখ্যাত দেবদাসী নাত্যের প্রবর্তক।

পরবর্তীকালে যখন রাজন্যবর্গে’র চিত্তবিনোদনের উদ্দেশ্যে দেবদাসীদের রাজসভায় টেনে আনা হ’ল, তখন থেকেই দেবদাসীদের নৈতিক অধঃপতনের ঘটল সূত্রপাত। সাত্ত্বিক ননৃত্যধারায় এসে মিলিত হ’ল রাজসিক ও তামসিকতা। দেবদাসীদের পবিত্রতা ক্রমেই পকিল হয়ে উঠল। পরিণামে দেবদাসী প্রথা ভঙকালের গহ্বরে সমাধিস্থ হ’ল । জনমানসে তাঁরা হলেন কিংবদন্তীর নায়িকা।
আজ দেবদাসীরা আর নেই। সংখ্যালঘু, হয়ে যে কজন এখনো জীবিত আছেন, তাঁদের অস্তিত্বও আজ হয়ত বিপন্ন। কিছু গুড়িসী নৃত্য আজ বিশ্বের দরবারে পৌঁছে গেছে। জগৎ সভায় তার কদর বেড়েচে ৷ নৃত্যগীত পিপাসুরা আজ এই নাত্যের আঙ্গিক (টেকনিক ) ও ইতিহাস জানতে উৎসুক। আজ আর ওড়িসা নত্যে অবহেলিত — অবজ্ঞাত নয়। ওড়িসী নৃত্য ছন্দ আজ যাঁরা বৃহত্তর ক্ষেত্র প্রচারিত ও প্রশংসিত করে তুলেচেন তাঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখ্য দুটি নাম — শ্রীমতী ইন্দ্রানী রহমান ও শ্রীমতী সংয,ত্তা পানিগ্রাহী।
ওড়িসী নৃত্যগালির মধ্যে প্রধান কয়েকটি হ’ল ভূমিপ্রণাম (মঙ্গলাচরণ), বিঘ্নরাজ পূজো, বটুনৃত্য, ইষ্টদেব বন্দনা, স্বরপল্লবী, সাভিনয় ও তরিঝম ।—
ভূমিপ্রণামে যে ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিমা প্রদর্শিত হয়, সেই ভঙ্গিমাই ওড়িসী নৃত্যের প্রধান ভঙ্গিমা। ভূমি প্রণাম দ্বারা মঙ্গলাচরণের পর, রজবিঘ্নণাপ্তির জন্য যে নৃত্যাভিনয় হয়, তাকে বলা হয় বিপ্লরাজ পূজো, বটুন তো বটুক ভৈরবের মহিমা কীৰ্ত্তিতি হয় । ওড়িসী নৃত্যের শাস্ত্রীয় অঙ্গ হিসেবে বটুন তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়। জয়দেবকৃত গীতগোবিন্দের সুললিত পদের আধারে ইষ্টদেবের বন্দনা-নৃত্য প্রদর্শিত হয় । এ-দেশীয় নৃত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হল স্বরপল্লবী নৃত্য।
রাগালাপনের সঙ্গে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তথা অন্যান্য ভঙ্গি সহযোগে স্বরপল্লবী নতো দেখানো হয়। আলাপচারীর পর আসে লয় ও তালের সঙ্গে মনোরঞ্জক পদ সঞ্চালন। নৃত্যের পরিভাষায় এই অঙ্গকে বলা হয় নত । এর পরের পর্যায়ে যে অংশ দেখানো হয়, তাহ’ল ভাবাশ্রয়ী নৃত্য । স্বরপল্লবী শেষ করা হয় প্রতে লয়ের নত্যছন্দে। সাভিনয় নাত্যে সাহিত্য, সঙ্গীত ও অভিনয়—এই তিনটির সমন্বয় থাকে। লাস্য দিয়ে শহর,, ভক্তিমাধর্ষে শেষ ।
গীতগোবিন্দের পদ ছাড়াও পরবর্তীকালে বনমালী দাস, গোপালকৃষ্ণ পট্টনায়ক, উপেন্দ্র ভঞ্জ, কবিসর্থে বলদেব, বোধের প্রভৃতি কবিদের পদাবলী এই নাত্যের সঙ্গে গীত হয়। রাগ, তাল ও নাত্যের শাস্ত্রীয় অননুশাসন এতে পালিত হয়ে থাকে খুব পবিত্রতার সঙ্গে। তরিঝম, হল আনন্দ নৃত্যে । নত্য বলা হলেও, এতে নত্তেই প্রধান। চার মাত্রার পহপট ও ছয় মাত্রার ঝুলা তালে দ্রুতে লয়ে, নতৃত্যের বোল আবৃত্তি করে এই নৃত্য পরিবেশিত হয়। একে নাট্যঙ্গী বলা হয়।
নৃত্যের বোলকে ওড়িসী নৃত্যের পরিভাষায় বলা হয় উকুট্টা ।—‘দশর পক’কার ধনঞ্জর বর্ণিত নাট্য (রসাশ্রিত), নৃত্য (ভাবাশ্রিত) ও নত্তে-এর (তালাশ্রিত) সমন্বয় ওড়িসী নৃত্য দেখা যায়। জাঙ্গিক, বাচিক, সাত্ত্বিক ও অহার্থ—এই চার প্রকার অভিনয়ই এই নৃত্যশৈলীতে প্রযুক্ত হয়। ওড়িসা নাত্যে যে রাগ-রাগিনী ও তাল প্রযুক্ত হয়, তা’র সঙ্গে দক্ষিণী ও উত্তরী পদ্ধতির রাগ-ভালের মিল লক্ষণীয়।
মোটাম,টি ভাবে এই হ’ল ওড়িসী নৃত্যের সাধারণ ও সংক্ষিপ্ত রূপ-রেখা । অননুসন্ধিৎসুরের জানবার বা গবেষণার মত বহ, উপাদান এই নৃত্য আছে।
